search the site
নিউমুরিং ইজারায় তড়িঘড়ি চুক্তি?

চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর হচ্ছে দেশের অর্থনীতির হৃদপি-। আর, সেই বন্দরের হৃদপি- নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এবং নিজস্ব টাকায় সংগৃহীত অত্যাধুনিক, স্বয়ংসম্পূর্ণ ভারী যন্ত্রপাতি (ইকুইপমেন্ট) সমৃদ্ধ সবচেয়ে বড় স্থাপনা হচ্ছে এনসিটি। বন্দরের সর্বাপেক্ষা এবং নিরবচ্ছিন্ন লাভজনক টই নিউমুরিং টার্মিনাল (এনসিটি) তড়িঘড়ি ইজারা দেয়ার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে যে কোনো সময়ে- এ নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রম অঙ্গনে ফের ক্ষোভ-অসন্তোষ বিরাজ করছে। দেখা যাচ্ছে নানামুখী প্রশ্ন-কৌতূহল ও সন্দেহ। সারা দেশ ও জনগণ যখন তুমুল উৎসাহের সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনমুখী এবং ভোটের বাকি আছে আর মাত্র দুই সপ্তাহ, তখনই এনসিটি বিদেশি কোম্পানিকে ইজারায় ছেড়ে দেয়ার চুক্তির তোড়জোড় করা হচ্ছে। বন্দর শিপিং সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এনসিটি বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া যাবে কিনা এই প্রশ্নে গতকাল বুধবার উচ্চ আদালতে রিট শুনানি শেষ হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণা হলে এবং তাতে যদি চুক্তির বাধা দূরীভূত হয়, তাহলে ডিপি ওয়ার্ল্ড নামক বহুল আলোচিত সেই দুবাইভিত্তিক কোম্পানির সঙ্গে আজকের মধ্যেই রাজধানী ঢাকায় বিদ্যুৎবেগে দীর্ঘময়াদি চুক্তির তোড়জোড় চলছে। অথবা আগামী ১ ফেব্রুয়ারি রোববারের মধ্যেই চুক্তি স্বাক্ষর সেরে ফেলতে চায় সরকারি মহল। চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা একযোগে গতকালসহ কয়েকদিন ধরে নিয়ে নিয়ে ব্যস্ততায় ঢাকায় অবস্থান করছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বন্দরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, সবকিছুই নির্ভর করছে আদালতের নির্দেশনা বা রায় কী আসে তার ওপর।
এ প্রসঙ্গে আন্দোলনরত শ্রমিক কর্মচারী জোট স্কপের নেতা ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক সাবেক বন্দর সিবিএ নেতা কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের প্রাণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারায় ছেড়ে দেয়ার অপচেষ্টা হলে চলমান আন্দোলনের কর্মসূচি আরো তীব্র হবে। শ্রমিক কর্মচারীরা ঐক্যবদ্ধভাবে তা রুখে দাঁড়াবে। আমাদের প্রশ্ন- ফ্যাসিবাদী পতিত হাসিনা আমলে নেওয়া জাতীয় স্বার্থবিরোধী বন্দর-ইজারার সিদ্ধান্ত বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কেন, কোন স্বার্থে বাস্তবায়নের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে? তিনি আরো বলেন, গোটা দেশ যখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত তখনই আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তির বৈতরণী পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গতকাল দুপুরে চট্টগ্রামে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) এক জরুরি সভা স্কপের চট্টগ্রাম যুগ্ম আহ্বায়ক এস কে খোদা তোতনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। এতে বলা হয়, আজ বিকালে স্কপের এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে চলমান আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এদিকে বর্তমানে যে কোনো সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের হৃদপি- এনসিটি এবং এর আগে লালদিয়া চর, পানগাঁও টার্মিনাল, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালসহ আরো চারটি কন্টেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে ইজারায় ছেড়ে দেয়া হলে- তখন অবশিষ্ট থাকবে শুধুই বস্তার মালামাল ওঠানামার সেই মান্ধাতা স্থাপনা জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি)। চট্টগ্রাম বন্দর হারাবে প্রতিবছর মুনাফা অর্জনের ধারাবাহিকতা। শ্রমিক কর্মচারী নেতারা জানান, লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল থেকেই ডিপি ওয়ার্ল্ড কোম্পানি নিয়ে যাবে বছরে কমপক্ষে ১১শ’ কোটি টাকা। গত বছরের ৭ জুলাই থেকে নতুন চুক্তিতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাই ডক দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সাথে এনসিটি পরিচালনা করছে। তাতে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারীরা সন্তুষ্ট বলে জানিয়ে আসছে। এক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানি ইজারা পেয়ে গেলে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। কর্মহীন হবে হাজারো শ্রমিক কর্মচারী এবং দক্ষ অদক্ষ জনবল। তাছাড়া নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদগণ বলে আসছেন, নৌবাহিনীর প্রধান স্থাপনার লাগোয়া নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে ছেড়ে দেয়া হলে দেশের নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়টিও স্পর্শকাতর।
এর আগে, গত ১৭ নভেম্বর’২৫ইং চট্টগ্রাম বন্দরের পরিকল্পিত লালদিয়া চর কন্টেইনার টার্মিনালকে ডেনমার্কের কোম্পানিকে এবং চালু থাকা ঢাকার অদূরে পানগাঁও নৌ টার্মিনালটি সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠানকে অস্বাভাবিক ঝটিকা বেগে ঢাকায় দীর্ঘমেয়াদে ইজারা চুক্তিতে ছেড়ে দেয়া হয়। চুক্তির যাবতীয় শর্তাবলীও রাখা হয় গোপন। ইতঃপূর্বে বিদেশি রেড সী কোম্পানিকে হস্তান্তর করা হয় পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি)। এনসিটি ছাড়াও বন্দরের পুরনো কন্টেইনার টার্মিনাল সিসিটি ইজারা পেতে ঘুরছে কয়েকটি বিদেশি কোম্পানি। চট্টগ্রাম বন্দরের সুপার স্ট্রাকচার সমৃদ্ধ সর্বাধুনিক কন্টেইনার টার্মিনাল হচ্ছে নিউমুরিং। এটি চট্টগ্রাম বন্দরের ধারাবাহিক লাভজনক এবং সক্ষমতা সম্পন্ন। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল এনসিটি বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এবং অত্যাধুনিক ভারী ইকুইপমেন্ট (যান্ত্রিক সরঞ্জাম) কেনা হয়েছে। এনসিটি দুবাই ভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ১৫ থেকে ২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি ইজারা চুক্তিতে ছেড়ে দেয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ।
এনসিটিসহ বন্দরের স্থাপনা ইজারাদানের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম এবং ঢাকায় গত প্রায় এক বছর ধরে শ্রমিক কর্মচারী সংগঠন, পেশাজীবী, সামাজিক ও রাজনৈতিক দল মাঠে ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে আসছে। এরমধ্যে ছিল মশাল মিছিল, গণমিছিল, বিক্ষোভ সমাবেশ, ঘেরাও, বন্দর অবরোধ, শ্রমিক জনসভা, স্মারকলিপি প্রদান, লংমার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচি। একের পর এক দেশের প্রধান চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার টার্মিনালসমূহ বিদেশি কোম্পানির হাতে ইজারা দিয়ে হাতছাড়া করার বিরুদ্ধে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছে শ্রমিক-কর্মচারী, নাগরিক, পেশাজীবী, সামাজিক ও রাজনৈতিক মহল। আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে মাঠে রয়েছে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল, শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)সহ প্রতিনিধিত্বশীল বিভিন্ন সংগঠন।
আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারী, পেশাজীবী, রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানে উৎখাত ও পলাতক ফ্যাসিবাদী হাসিনার সরকার পতনের আগেই (২০২৩-২৪ সালে) চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটিসহ টার্মিনালগুলো বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কেন আওয়ামী ফ্যাসিস্ট হাসিনার সেই জাতীয় স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে? চট্টগ্রাম বন্দরের কোথাও এক ইঞ্চি জায়গাও বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দেয়া যাবে না। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও ভূ-কৌশলগত নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনার জন্য বন্দর তথা দেশের দক্ষ-অভিজ্ঞ শ্রমিক-কর্মচারীসহ বৃহৎ জনসম্পদই যথেষ্ট সক্ষম।
চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতি বছর মুনাফা বাবদ নিজস্ব আয়েই গড়ে উঠেছে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। গত ১৭ বছর যাবত এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ একক যোগান দিয়ে আসছে। মোট কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ৪৪ শতাংশই সামাল দিচ্ছে এনসিটি। এই এনসিটি দ্বারাই গৌরবের আসনে চট্টগ্রাম বন্দর। আগের অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেকের হাত থেকে বদল হয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ড্রাইডক লি. মাধ্যমে গত ৭ জুলাই থেকে পরিচালিত হচ্ছে এনসিটি। দুর্নীতিমুক্ত এবং সুদক্ষ, সুশৃঙ্খল, গতিশীল, স্বচ্ছতার সাথে পরিচালনার ফলে এনসিটিতে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ইতোমধ্যে বেড়েছে ২৭ শতাংশ। আমদানি-রফতানিকারক, ব্যবসায়ী, বন্দরব্যবহারকারীরাও (স্টেক হোল্ডারগণ) বর্তমানে এনসিটির পারফরমেন্সে সন্তুষ্ট। এনসিটি সুপার স্ট্রাকচারাল এবং সর্বাধুনিক গ্যানট্রি ক্রেনসহ যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ হওয়ায় এখানে নতুন করে বিনিয়োগের আর কোনো অবকাশ বা প্রয়োজনও নেই। জোয়ার-ভাটা নির্ভর এবং আঁকাবাঁকা ও সাড়ে ৯ থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের সীমিত চ্যানেলের ধারেই এনসিটির অবস্থান। এতে করে এনসিটিতে যথেচ্ছ ‘বড়সড়’ এবং ‘অগণিত’ জাহাজ বার্থিংয়ের (ভিড়ার) কোনো টেকনিক্যাল সুযোগই নেই। তাছাড়া এনসিটির সঙ্গে লাগোয়া নেভির গুরুত্বপুর্ণ স্থাপনা থাকায় এর সাথে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও ভূ-কৌশলগত গুরুত্বের প্রশ্ন জড়িত বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অনেক আগেই সতর্ক করে আসছেন।
এনসিটি লিজ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দরে শনিবার কর্মবিরতির ডাক
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিউমুরিং টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অপারেশনাল কর্মবিরতির কর্মসূচি ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল এবং সাবেক সিবিএ। দুই সংগঠনের এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, আগামী ৩১ জানুয়ারি শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের সব অপারেশনাল কার্যক্রমে কর্মবিরতি পালন করা হবে। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল নেতা ইব্রাহিম খোকন এবং চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সাবেক সিবিএ নেতারা।
চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল ও সাবেক সিবিএ নেতা মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের একটি কৌশলগত ও লাভজনক টার্মিনাল। এটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেওয়া হলে বন্দরের রাজস্ব, কর্মসংস্থান ও জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবিতে কর্মবিরতি ঘোষণা করা হয়েছে।
দাবি মানা না হলে পরবর্তী সময়ে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার কথাও বিবেচনায় রয়েছে শ্রমিক সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন।
source : dailyinqilab


















