search the site
চট্টগ্রামের ৮ মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের এভারেস্ট বেইস ক্যাম্প জয়

আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের হাইকিং ও ট্রেকিং টিমের সকল সদস্য সুস্থ ও নিরাপদে দেশে ফিরে নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে গেছেন গতকাল ৭ অক্টোবর।
৪ অক্টোবর দুপুর নাগাদ এভারেস্ট বেইস ক্যাম্প ট্রেকিং শেষ করে, তুষারপাত ও বৈরী আবহাওয়া চলমান থাকায় আমরা পরদিন ৫ অক্টোবর স্থানীয় গোরাকশেপ স্টেশন টু লুকলা রুটের জন্য হেলিকপ্টার বুক করি। কিন্তু ক্যাম্প শেষে লজে পৌঁছানোর পর পরই শুরু হয় অপ্রত্যাশিত প্রবল তুষারপাত। ৪/৫ ফুট বরফে হেলিপ্যাড চাপা পড়ে। কয়েকটি ঘরের ছাদ ধসে পড়ার খবর আসে। বন্ধ হয়ে যায় ইন্টারনেট ব্যবস্থা ও সব ধরনের যোগাযোগ। এভারেস্টের দক্ষিন পাশের প্রায় ১০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা পুরু বরফে ঢাকা পড়ে।
৫ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে তুষারপাত থেমে এলে, পরবর্তী সম্ভাব্য দূরাবস্থার আশংকায়, আর উপায়ন্তর না দেখে, আমরা এই এলাকা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই। কিছুটা পায়ে হেঁটে ও পরে দীর্ঘ একটা দূরত্ব ঘোড়ায় (পনি, নেপালী ছোট আকারের পাহাড়ি ঘোড়া) চড়ে সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার বরফের পথ পাড়ি দিয়ে রাত ৮টায় আমরা লির্ধারিত গন্তব্য প্যাংবুচে স্টেশনে পৌঁছাতে সক্ষম হই। পথে থেমে থেমে হালকা বৃষ্টি ও তুষারপাত হচ্ছিল। মাঝে লবুচে স্টেশনে দুপুরের বিরতি পাই। খাবার শেষে ফের যাত্রা। বিকেলের দিকে আকাশ পরিষ্কার হয়ে আসে। সন্ধ্যা নামলে পেরিশে নামক স্টেশনে যাত্রা বিরতি করি। পনিগুলোকে দানা-পানি খাওয়ানো হয়। সুযোগে আমরাও একটা পানশালায় ঢুকে চা পান করে ও ফায়ার প্লেসের সামনে দাঁড়িয়ে গা গরম করে নিই। রাতের আকাশে দেখা গেল পূর্নিমার চাঁদ। রাতের যাত্রার পুরোটা সময় চাঁদের আলোয় পথ দেখেছি। পেরিশে থেকে প্যাংবুচে যাবার সময় রাতের বেলা হিম ঠান্ডায় বরফে মোড়া ট্রেইলে কিছু কিছু সংকীর্ণ (আড়াই-তিন ফুট) ও খুব খাড়া-ঢালু পথে ঘোড়ায় চলার কথা মনে পড়লে এখনো গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে। দোয়া-দরুদ ও তসবিহ পড়েছি অনবরত। বরফের উপর একনাগাড়ে পায়দল চলা ঘোড়ার সহিসদের দক্ষতা, আন্তরিকতা, ধৈর্য্য, পরিশ্রম ও কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা অবাক করেছে আমাদের প্রত্যেককে।এই এক দিনে প্রায় ১২০০ মিটার ডিসেন্ডিং করি আমরা।
পরদিন ৬ অক্টোবর সকালে হেলিকপ্টারে চড়ে প্যাংবুচে থেকে লুকলা অবতরণ করি আমরা। শুরু হয় কাটমান্ডুগামী কপ্টার ফ্লাইটে সিরিয়ালের অপেক্ষা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দেখি এয়ারপোর্ট স্টাফরা একটা স্ট্রেচারে করে কাপড়ে মোড়ানো একটা বডি বহন করে টার্মিনাল ভবনের পেছনে নিয়ে এসেছে। শুনছিলাম, গত দুইদিন ধরে হেলিকপ্টারগুলো ট্রেকার রেসকিউ মিশন নিয়ে বেশ ব্যস্ত ছিল। যদিও তখন পর্যন্ত আমরা কোন ক্যাজুয়্যাল্টি ইনফরমেশন পাই নাই। একটু পর পুলিশ এলো। সুরতহাল পরিদর্শনের সময় বডি উন্মুক্ত করা হলে আমাদের সদস্য মোহান্নদ আলী আমাকে জানায়। আমিও কৌতুহলবশতঃ সেখানে যাই ও পুলিশের পাশে দাঁড়িয়ে মৃতদটা দেখি। বেদনায় ভরে যায় মন-প্রান। কোরিয়ান চেহারার মাঝ বয়সী পুরুষ। দু’চোখের পাতা বন্ধ, ঘুমিয়ে আছে যেন। আগা-গোড়া ট্রেকিং গিয়ার পরনে। হাঁটুর নিচ থেকে গোড়ালী পর্যন্ত শক্ত বরফ জড়িয়ে আছে। দামী হাইকিং বুটের অংশ বিশেষ দেখা গেল। খবর নিয়ে জানলাম, এই ট্রেকার ‘মেরা’ পিক ক্লাইম্বিং এ গিয়েছিল নেপালী গাইডসহ। তুষার ঝড়ের কবলে পড়ে ও বরফ ধ্বসে প্রাণ হারায়। গাইড বেঁচে যায়। পরে নেপালী ট্রেকার গাইড এসোসিয়েশন এ নিয়ে তাদের ফেসবুক পেইজে পোস্ট দেয় (কমেন্টে)।
যাই হোক, এ দিন লুকলা থেকে কাটমান্ডু পৌঁছায় দলের ৬ সদস্য। স্বেচ্ছায় সবার শেষে সিরিয়াল নেয়ায় সেদিনই আর লুকলা ছাড়া হয় না আমার। বিকেল পৌনে ৫টায় এয়ারপোর্টের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষনা করা হয়, অথচ ফ্লাইটের জন্য সকাল সাড়ে দশটা থেকে অপেক্ষা করে আছি। প্রতিটি ৪ যাত্রী ক্যাপাসিটির প্রায় একডজন কপ্টার কোম্পানির ফ্লাইট অপারেশন হয় এখানে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে গত দুইদিন এয়ারপোর্ট বন্ধ থাকায় সারাদিন যাত্রীর চাপ ছিল প্রচুর। সবার গন্তব্য কাটমান্ডু। সূর্যাস্তের পর এখানে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি নাই। কিছুটা চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম, কেননা পরদিনই দুপুরে আমাদের ফিরতি ফ্লাইট কাটমান্ডু টু ঢাকা। আমাদের এয়ার লাইন কোম্পানির অপারেশন চীফ আমার জন্য দুঃখ প্রকাশ করল আর কথা দিল পরদিন প্রথম ফ্লাইটেই আমাকে সিট দেবে।
মনে মনে তথাস্তু বলে বিষন্ন চিত্তে ব্যাগ-লাগেজ নিয়ে গ্রীন ভ্যালি ট্রেকিং কোম্পানির গাইডের তত্ত্বাবধানে পাশে একটি লজে উঠি রাত যাপনের জন্য। সেখানে দেখা হয় কথা হয় সিংগাপুর ও অস্ট্রেলিয়া থেকে আগত বেশ কয়েকজন পর্যটক-ট্রেকারের সাথে। তারা সবাই-ই মাঝপথ থেকে ট্রেকিং অসম্পন্ন রেখে নেপাল ত্যাগ করছে তুষারপাতের কারণে।
কথা রেখেছিল কপ্টার কোম্পানী। পরদিন ৭ অক্টোবর সকালে প্রথম ফ্লাইটে লুকলা ছাড়ি। এরপর বেলা ৩টার বিমানে দেশের পথে।
আমাদের এবিসি ট্রেকিং অভিযাত্রা ও সাফল্যের কথা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই দৈনিক সমকাল, বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালবেলা, খবরের কাগজ, পূর্বকোণ, পূর্বদেশ এবং পোর্টাল সিভয়েস২৪ কে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন আমাদের ট্রেকিং স্টোরি কমিউনিটির সাথে শেয়ার করায় তাঁদের ধন্যবাদ জানাই।
বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই আপনাদের, যাঁরা এ দশটা দিন আমাদেরকে দোয়ায় রেখেছেন এবং পরামর্শ ও উৎসাহ দিয়ে গেছেন।
শাহ আমানত বিমানবন্দরে ফুল দিয়ে আমাদের বরণ করে নেয়ায় ধন্যবাদ আবরার-আহিয়ানের মা’কে।
নিচের ছবিটি ৭ অক্টোবর কাটমান্ডুতে হোটেল বুটিক বিভো এর আউটডোর লাউঞ্জে তোলা।
( পুনশ্চঃ এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে আসা আপন স্ত্রী নাকি আমাকে খুঁজে পাচ্ছিল না, অথচ সামনেই দাঁড়ানো আমি। মানছি চুল-দাঁড়ি-গোঁফ বেশ অবিন্যস্ত ছিল। ঘরে ফিরে আয়নাতে ভালো করে তাকালে দেখি পুরো মুখ ও ঠোঁটে আইস বার্ন হয়ে গেছে, রক্ষা পেয়েছে চোখ দুটির আশপাশ, সানগ্লাসের কল্যানে। ওজন কমেছে ২.২ কেজির মত।শরীরের ভারসাম্য ফিরে আসতে হয়তো আরো দিন দুয়েক লাগবে।কমেন্টে একটা ইউটিউব লিংক শেয়ার করেছি, হেলিকপ্টার ফ্লাইট ভিডিওগ্রাফী, পুরো ট্যুর ম্যাপিং ক্লিয়ার হয়ে যাবে।)


















