আমরা জীবনে চলার পথে, নানাভাবে নানা ধরনের মানুষের সাথে পরিচিত হই।আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ (৪৭/ই)

Comments Off on আমরা জীবনে চলার পথে, নানাভাবে নানা ধরনের মানুষের সাথে পরিচিত হই।আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ (৪৭/ই)

আমরা জীবনে চলার পথে, নানাভাবে নানা ধরনের মানুষের সাথে পরিচিত হই। আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ (৪৭/ই)

22 January 2024

আসসালামু আলাইকুম। 

বছরখানেক আগে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি এয়ারপোর্ট থেকে দেশে ফিরছিলাম। ফাইনাল বোর্ডিংয়ের জন্য ওয়েট করছি, এমন সময় পরিচিত একজন সিনিয়রকে দেখলাম। পরিচিত বলতে, একতরফাভাবে আমি স্যারকে চিনি কিন্তু উনি আমাকে চিনেন না সেভাবে। ২০১৮ থেকে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন উপলক্ষে স্যারকে মেসেজ দিয়েছি কিন্তু কখনোই কোন রেসপন্স পাইনি। স্যার বেশ বড় পদে চাকরি করেন এবং অবশ্যই অনেক ব্যস্ততায় থাকেন ৷ কিন্তু উনার চেয়েও বড় পদে, বেশি ব্যস্ত অনেক সিনিয়রকে জানি যারা ছোট্ট করে হলেও মেসেজের রিপ্লাই দেন/দিয়েছেন। জানি না কেন উনি কখনোই কোন শুভেচ্ছার রিপ্লাই দেননি। সেদিন স্যারকে দেখে আমি দ্বিধাবোধ করছিলাম যে, সালাম দিয়ে কথা বলবো নাকি বলবো না। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে পরে দেখা না করার সিদ্ধান্ত নেই। আসলে আমার মতো প্রায় ২০ বছরের জুনিয়রের সালাম/কুশলাদি বিনিময় উনি কতটা ওয়ার্মলি নিবেন সেটা নিয়েই আমার সন্দেহ ছিল যেহেতু আগে কখনো কোন মেসেজের রিপ্লাই দেননি। এমনও না যে আমি চাকরি চেয়ে স্যারকে মেসেজ দিয়েছি।

যা হোক, আমরা জীবনে চলার পথে, নানাভাবে নানা ধরনের মানুষের সাথে পরিচিত হই। কিন্তু এদের মধ্যে কতজনকে পাবেন যারা র‍্যাংক বা টাকা না দেখে, শুধুমাত্র একজন ভালো মানুষ হিসেবে আপনাকে মন থেকে সালাম দেয়, শ্রদ্ধা করে? কতজন আপনার বর্তমান পদ চলে গেলেও একজন ভালো মানুষ/সিনিয়র হিসেবে আপনার খোঁজ খবর নিবে?

জাহাজে থাকাবস্থায় আপনি ক্যাপ্টেন, চিফ বা সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে হয়তো সালাম পান সকাল বিকেল দুই বেলা। কিন্তু জাহাজ থেকে নামার পর, ডিজি শিপিংয়ে বা চিটাগাং শিপিং অফিসে আপনাকে দেখেও যদি আপনার এক্স-কলিগ/জুনিয়র আপনার অজান্তে এড়িয়ে যায় তাহলে সেটা দু:খজনক। আমরা যারা এখন সিনিয়র র‍্যাংকে প্রমোশন পাচ্ছি, আমাদের বিশেষভাবে খেয়াল রাখা উচিত যে আমরা কোন ধরনের সিনিয়র হতে চাই-

“তাদের মতো যাদের দেখে জুনিয়র/পরিচিতরা নিজ থেকে এগিয়ে এসে কুশলাদি বিনিময় করবে নাকি তাদের মতো যাদের দূর থেকে দেখেই পরিচিতরা আড়ালে চলে যাবে যেন অমুক স্যারের মুখোমুখি হতে না হয়!”

আমাদের পেশায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিচিত কাউকে দ্বিতীয়বার কলিগ হিসেবে পাওয়া যায়না। প্রতিবারেই নতুন নতুন মানুষের সাথে কাজ করতে হয়, পরিচিত হতে হয়। আমাদের এই ৪/৬/৯ মাস সময়ের কার্যকলাপ/ব্যবহারের ভিত্তিতে নিজেকে এমন অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত  যেন আমার অসুস্থতা/মৃত্যুর খবর শুনলে সেই এক্স-কলিগ/জুনিয়রের মনে হয়, “আহা! উনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন।” জানিনা আর কে কি ভাবে, তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ভালো মাস্টার/চিফ ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার চাইতে ভালো মানুষ হওয়াটা বেশি জরুরি।

আমার প্রথম জাহাজে একজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন পেয়েছিলাম যিনি উনার ক্রুদের নিজের পরিবারের মতো আগলে রাখতেন। ক্যাডেট বলে কখনো আমাদের অবহেলা/ছোট করার চেষ্টা করেননি। বরং আমাদের সবসময় আরও বেশি বেশি খোঁজ খবর নিতেন। একই জাহাজে উনার পরে আরেকজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন আসেন যিনি মানুষ এবং মাস্টার দু’হিসেবেই যাচ্ছেতাই ছিলেন। প্রথম সেই ক্যাপ্টেনের নাম কামাল আইয়ুব যার সাথে আমার ১০ বছর পর এখনো নিয়মিত যোগাযোগ হয়। আর পরের যে ক্যাপ্টেন তার সাথে যোগাযোগ তো দূরের কথা, উনার নামই সঠিক মনে নেই। তাদের কারো সাথেই আমার দ্বিতীয়বার দেখা হয়নি, আগামীতেও কোন  সম্ভাবনা নেই বলা চলে। কিন্তু তারা দু’জন দুইভাবে আজীবন আমার মনে রয়ে যাবে এবং দ্বিতীয় ক্যাপ্টেন চাইলেও তার সম্পর্কে আমার ধারণা বদলাতে পারবেনা যেহেতু এই পেশায় পুনর্মিলন খুব কদাচিৎ ঘটে।

তাই আমার মনে হয় মানুষ এবং পেশাগতভাবে আমাদের এমন হওয়া উচিত যেন আমাদের সংস্পর্শে যারা আসবে তারা আমাদের অবর্তমানে/আড়ালে আমাদের সম্পর্কে ভালো কিছু বলে, ভালো মানুষ হিসেবেই মনে রাখে। আমরা সবাই যেন ডিজি শিপিং বা অন্য কোথাও এক্স-কলিগ/জুনিয়রদের সাথে দেখা হলে মন থেকে সালাম, শ্রদ্ধা আর ভালবাসা পাই। আমাদের দেখে কেউ যেন ইচ্ছাকৃতভাবে দৃষ্টির আড়ালে চলে না যায়….

বিনীত,

আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ (৪৭/ই)

Comments are closed.