ডেজার্শন বন্ধে সরকারকে যথাযথ, সময়োপযোগী এবং কঠোর আইন প্রনয়ণ করার অনুরোধ

Comments Off on ডেজার্শন বন্ধে সরকারকে যথাযথ, সময়োপযোগী এবং কঠোর আইন প্রনয়ণ করার অনুরোধ

ডেজার্শন বন্ধে সরকারকে যথাযথ, সময়োপযোগী এবং কঠোর আইন প্রনয়ণ করার অনুরোধ

আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ (৪৭/ই) 22 August 2022

বছরখানেক আগে মেরিনারদের সমস্যা আর সম্ভাবনা নিয়ে আমার একটা লেখার উল্লেখযোগ্য পয়েন্ট ছিল বিদেশি পোর্টে বাংলাদেশিদের ডেজার্শন বা পালিয়ে যাওয়া বন্ধে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। দুঃখজনকভাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং কর্তৃপক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কঠোর কোন আইন প্রনয়ণ বা কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া হয়নি যাতে কোন বাংলাদেশি মেরিন অফিসার বা ক্রু ইউরোপ, নর্থ আমেরিকা কিংবা অন্য কোথাও পালিয়ে গেলে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া যায়। যারা পালিয়ে যাচ্ছে পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা খুব ভালোভাবেই জানে যে, ২/১ সপ্তাহ সোশ্যাল মিডিয়ায় হায়-হুতাশ করা আর তাদের ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দেয়া ছাড়া বাংলাদেশের মেরিনাররা আর কিছুই করতে পারবেনা। তারা সর্বদা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকবে, যেমনটা আগে যারা পালিয়েছে তারা আছে! প্রকৃতপক্ষেই যারা এমনটা করে তারা রাজাকার, যুদ্ধাপরাধীদের চেয়ে কোন অংশে কম না। তারা নিঃসন্দেহে দেশ এবং জাতির শত্রু। মাত্র একজনের এমন ব্যক্তিস্বার্থের জন্য হাজার মেরিনারকে চাকরি হারাতে হয়, কলঙ্ক বইতে হয়, আর দেশকে বঞ্চিত হতে হয় লাখ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স থেকে!

সাধারণত জাহাজ পোর্টে গেলে পোর্ট অথরিটি থেকে অনবোর্ড সবাইকে সাময়িকভাবে একটা ‘পাশ’ ইস্যু করা হয় (Shore Pass) যেন জাহাজ পোর্টে থাকাবস্থায় আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে পারে। এটা অত্যন্ত চমৎকার এবং প্রয়োজনীয় একটা ব্যাপার, বিশেষ করে একটানা দীর্ঘদিন সমুদ্রে থাকার পর ‘শোরলিভ’ একটা রিফ্রেশমেন্ট মেরিনারদের জন্য। পোর্ট অথরিটির এমন সুচিন্তার ফলে যে সুযোগ আমরা ইউরোপ আমেরিকা বা অন্যান্য সব দেশে পেয়ে থাকি, সেটাকেই ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য অনেকে নেগেটিভভাবে ব্যবহার করে। শোরলিভে গিয়ে আর জাহাজে ফিরে আসেনা, উন্নত দেশেই থেকে যায়! সাধারণ মানুষের কাছে এমন ঘটনা তেমন কোন বড় বিষয় নয় কিন্তু আমাদের মেরিনার কমিউনিটির উপর তথা দেশের অর্থনীতির উপর এটা কত ব্যাপক প্রভাব ফেলে সে সম্পর্কে কিছু ধারণা দিচ্ছি। 

অতি সম্প্রতি বাংলাদেশি ২ জন নাবিক পালিয়ে যাবার একটা অত্যন্ত লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেছে কানাডার ভ্যানকুভারে। জাহাজে একজন সেকেন্ড অফিসার আর তিনজন ক্রুসহ মোট চারজন বাংলাদেশি ছিল। আগে যেমনটা বলেছি, জাহাজ পোর্টে গেলে শোরপাশ দেয়া হয় এবং বাংলাদেশি দুইজন শোরলিভে যাবার নামে বের হয়ে আর জাহাজে ফেরত আসেনি। এই ঘটনার কয়েকটি ফলাফল সংক্ষেপে উল্লেখ করছি-

-জাহাজে থাকা বাকি ২ জন বাংলাদেশিকে সাথে সাথে চাকরিচ্যুত করে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তাও স্বাভাবিকভাবে ওদের নামানো হয়নি, কানাডার কাস্টমস গার্ড দিয়ে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছে বন্দীদের মতো! কতটা লজ্জা আর অপমানজনক একটা ব্যাপার ভাবা যায়? 

-জাহাজ কোম্পানিকে প্রায় ১ লাখ ডলার জরিমানা দিতে হয়েছে।

-জাহাজ পোর্টে ডিটেইন্ড করা হয়েছিল অনির্দিষ্টকালের জন্য, ফলশ্রুতিতে প্রতিদিন জাহাজ ভাড়া বাবদ ২৫/৩০ হাজার ডলার লস করেছে কোম্পানি। 

-অথরিটি থেকে বিভিন্ন ধরনের অডিট, ইন্সপেকশন চালানো হয়েছিল জাহাজের আরও কোন খুঁত আছে কিনা খুঁজে বের করার জন্য। একের পর এক তদন্তকারীরা এসেছে জাহাজে, যা নিয়ে জাহাজের সবার নাভিশ্বাস অবস্থা হয়েছিল! 

-জাহাজ যারা ভাড়া করেছিল তাদের ৪৫ মিলিয়ন ডলারের কার্গো সময়মতো পরের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে না পারায় বাড়তি লস আর ভোগান্তির মধ্যে পড়েছিল কোম্পানি। সব মিলিয়ে কোম্পানিকে প্রায় ৪/৫ লাখ ডলার জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে ২ জন দেশদ্রোহী বাংলাদেশির জন্য।  

আপনি যদি সেই কোম্পানির মালিক হন তাহলে এত এত ঝামেলার পর আর কোনদিন বাংলাদেশি কোন মেরিনার রিক্রুট করবেন? ইন্ডিয়ান বা ফিলিপিনো মেরিনাররা আমাদের চেয়ে কোন অংশে কম কোয়ালিফাইড না বরং আমাদের চেয়ে ওদের জন্য যেকোন দেশের ভিসা পাওয়া আরও সহজ। তাহলে কিসের জন্য বাংলাদেশিদেরকে ইন্ডিয়ান বা ফিলিপিনোদের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়া হবে? এছাড়া জাহাজ মালিকদেরও এসোসিয়েশন আছে, সেখানে যদি সবাই সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশি মেরিনারদের আর রিক্রুট না করার, আমাদের কিছু করার আছে কি? ধরা যাক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা বা আমেরিকা বাংলাদেশি মেরিনারদেরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলো যেটা কোন ব্যাপারই না ওদের জন্য, তাহলে আমরা কোথায় যাবো? আর আমরা বাংলাদেশি মেরিনাররা যদি জাহাজে জয়েন করতে না পারি তাহলে দেশের অর্থনীতিতে এতবড় একটা রেমিট্যান্সের যোগান কারা কিভাবে দিবে? একজন ক্যাপ্টেন/চিফ ইঞ্জিনিয়ার জাহাজ এবং কোম্পানিভেদে ৮ থেকে ১৬ হাজার ডলার পর্যন্ত স্যালারি পায় প্রতিমাসে! উল্লেখ্য, বাংলাদেশি সমস্ত মেরিনারের স্যালারি সবসময় যথাযথ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে আসে, কোন হুন্ডি বা তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়া। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ যখন ডলার সংকটে ভুগছে তখন বাংলাদেশি মেরিনারদের পাঠানো লাখো ডলার অর্থনীতিতে কত বড় ভূমিকা রাখছে তা সহজেই অনুধাবনযোগ্য। অথচ আমাদের জন্য আলাদাভাবে উল্লেখযোগ্য কোন সুবিধা নেই সরকারের পক্ষ থেকে। এমনকি প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেসব সুবিধা পায় আমরা সেটাও পুরোপুরি পাইনা। 

যা হোক, উপরোল্লিখিত জাহাজে যে বাংলাদেশি সেকেন্ড অফিসার চাকরি হারিয়েছে এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তার স্যালারি ছিল মাসে ৪ হাজার ডলারের বেশি। সে অফিসার আরও ৬ মাস জাহাজে থাকলে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ২৫ হাজার ডলারের যোগান দিতে পারতো। কিন্তু ডলারের যোগান তো পরের কথা, এখন সেই কোম্পানির দরজাই আজীবনের জন্য বাংলাদেশিদের জন্য নিষিদ্ধ। এভাবে একের পর এক এসব ঘটনার জন্য আমাদেরকে বিভিন্ন কোম্পানিতে নিষিদ্ধ করলে আমরা কোথায় চাকরি করবো? কয়েকজনের স্বার্থান্বেষী কার্যক্রমের জন্য হাজার হাজার মেরিনার ভোগান্তির স্বীকার হচ্ছি, এর  সমাধান আমরা কার কাছে চাইবো?

অনেকে ভাবতে পারেন এটা বিচ্ছিন্ন একটা ঘটনা।  কিন্তু সত্যি বলতে, এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা প্রায় প্রতি বছরই কয়েকবার করে ঘটছে যেহেতু কার্যকর এবং কঠোর কোন আইন এখনো পর্যন্ত প্রণয়ন হয়নি। ২০২১ সালেও কানাডায় একজন পালিয়ে গিয়েছিল, তার কিছুদিন আগে স্পেন, এমনকি কলম্বিয়াতেও পালিয়ে যাবার রেকর্ড আছে। এভাবে দিনের পর দিন এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকলে সেদিন আর খুব বেশি দূরে নেই যেদিন বাংলাদেশি মেরিনারদের সব দেশে বা কোম্পানিতে ব্যান করা হবে, ব্ল্যাকলিস্টেড করা হবে। তাই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং ব্যক্তিবর্গদের আন্তরিকভাবে অনুরোধ করবো আমাদের মেরিনার কমিউনিটির তথা বাংলাদেশের সুনাম রক্ষার্থে, দেশের অর্থনীতি রক্ষার্থে ডেজার্শনের বিরুদ্ধে যত দ্রুত সম্ভব কঠোর এবং কার্যকর আইন প্রনয়ণ করুন। 

মেরিনাররা যেকোন দেশের জন্য সোনার ডিমপাড়া হাঁসের মতো! ভারত, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুরসহ সকল দেশের মেরিনাররা সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সাপোর্ট পেয়ে থাকে ওদের সরকারের পক্ষ থেকে। আশা করবো বাংলাদেশ সরকারও আমাদের মেরিনারদের দিকে  সদয় দৃষ্টি দিবেন এবং অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে এই সেক্টরের সমস্যাগুলো সমাধানের দ্রুত চেষ্টা করবেন। সরকারের সামান্য একটু সহায়তা, সহযোগিতা পেলে আমরা তা শতগুণে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে দিব ইনশাআল্লাহ।

বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দ্রুততম সময়ের মধ্যে যথাযথ, কার্যকরী এবং সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন করে পালিয়ে যাবার সমস্ত উপায় বন্ধ করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আশা করি,  আগামীতে এমন লজ্জাজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবেনা এবং আমরা বাংলাদেশি মেরিনাররা  বিদেশিদের সাথে মাথা উঁচু করে, সম্মানের সাথে কাজ করতে পারবো, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার সুযোগ পাবো।

Comments are closed.